এক টিকিটেই ৪১২ টাকা লোকসান রেলের!

একটি টিকিট বিক্রি করে সরকারের লোকসান হলো ৪১২ টাকা। রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পাওয়া নতুন প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের টিকিট বিক্রির তৃতীয় দিন সোমবার (২৮ মার্চ) এমন অনিয়ম দেখা গেছে।
এক টিকিটেই রেলের লোকসান ৪১২ টাকা!
জামালপুর এক্সপ্রেস একটি আন্তঃনগর ট্রেন। এটি ঢাকা-জামালপুর রুটে পর্যন্ত চলাচল করে। জামালপুরের তারাকান্দি রেলস্টেশন থেকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের প্রতিটি এসি সিটের দাম ৪৩২ টাকা। কিন্ত সহজ বিক্রি করেছে মাত্র ২০ টাকায়। এতে প্রতি টিকিটে সরকারের লোকসান হয়েছে ৪১২ টাকা।
তারাকান্দি রেলস্টেশন একটি নন কম্পিউটার স্টেশন, সেখানে টিকিট বিক্রি করা হয় হাতে লিখে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে অনলাইনে টিকিট বিক্রি হয় না। অনলাইনে টিকিট বিক্রির কোনো নির্দেশনা না থাকলেও তারাকান্দি স্টেশন থেকে অনলাইনে টিকিট বিক্রি করছে সহজ ডটকম, তাও আবার মাত্র ২০ টাকায়।
ইমরান হোসাইন নামে এক রেলযাত্রী মাত্র ২০ টাকায় জামালপুর এক্সপ্রেসের তারাকান্দি থেকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত একটি এসি সিট কিনেছেন। তিনি জানান, তারাকান্দির বাসিন্দা তিনি। তারাকান্দি স্টেশন থেকে কোনোদিনই অনলাইনে টিকিট বিক্রি করেনি বাংলাদেশ রেলওয়ে। তিনি ২৮ তারিখ কৌতুলহবশত সহজ ডটকমের নতুন ওয়েবসাইট দিয়ে তারাকান্দি থেকে টিকিট কেনার চেষ্টা করেন। আগে অনলাইনে সে স্টেশনের নাম না থাকলেও সহজের ওয়েবে সাইটে সে নাম পাওয়া যায় এবং তিনি অনায়াসে একটি এসি সিটের টিকিট কেনেন। তবে টিকিটের দাম রাখা হয় মাত্র ২০ টাকা।
সোহানের সিট নাম্বার হলো ‘খ’ বগির ৩০ নাম্বার আসন। চুক্তি অনুযায়ী অনলাইনে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ বাবদ ২০ টাকা করে কেটে নেওয়ার কথা। তার মানে হলো এ টিকিটের জন্য শুধু সার্ভিস চার্জ কেটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু টিকিটের কোনো মূল্যই রাখা হয়নি।
ইমরান হোসাইন আরও জানান, তারাকান্দি স্টেশন থেকে ঢাকার টিকিট পওয়া যাচ্ছে অনলাইনে, এসি আসন তাও আবার বিশ টাকায় এমন খবর প্রচার হলে অনেকেই টিকিট সংগ্রহ করেন একই প্রক্রিয়ায়। সোহান বলেন, তার বন্ধুরা মিলে ৫টি টিকিট কেটেছেন এভাবে। তারাকান্দি স্টেশনে অনলাইনে টিকিট নেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পরে তারা সে টিকিট সরিষাবাড়ি রেলস্টেশন থেকে প্রিন্ট করে নেন।
সোহান জানান, সেখানে তিনি অনেক যাত্রীকে দেখেছেন যারা এভাবে সরিষাবাড়ি স্টেশন থেকে টিকিট প্রিন্ট নিয়েছেন।
অনেক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন প্রযুক্তিতে টিকিট বিক্রির শুরুর পর থেকেই সহজের নানা রকম ভুলভ্রান্তি শুরু হয়েছে। যাত্রা পথে অনেক স্টেশনের নাম এখনও তারা সফটওয়্যারে সংযুক্ত করতে পারেননি। ফলে কাঙ্ক্ষিত স্টেশনের নাম পেয়ে বাধ্য হয়ে দূরের স্টেশনের টিকিট নিতে হচ্ছে। আবার অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, তার কাঙ্ক্ষিত ট্রেন সকাল ৭টায় ছাড়ার কথা থাকলেও নতুনভাবে দেওয়া টিকিটে দুপুর ১২টায় দেওয়া আছে।
রেলের ঢাকা বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শওকত জামিল মোহসি বলেন, ২৮ মার্চ ৪৩২ টাকার টিকিট মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি করছে সহজ। বিষয়টি তাদেরও নজরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে সহজের সঙ্গে যোগাযোগ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে সেটি সঠিক নিয়মে ফিরে এসেছে।
তবে শুধু জামালপুর এক্সপ্রেস নাকি অন্যান্য ট্রেনের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য রেলের কাছে নেই। জামালপুর এক্সপ্রেসের মোট কতটি টিকিট এভাবে লোকসান দিয়ে বিক্রি হয়েছে তা বের করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মোহসি বলেন, সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের বিক্রিত টিকিটের হিসেব দিতে। তাহলেই বোঝা যাবে মোট কত টিকিট কম দামে বিক্রি করেছে সহজ, আর এতে কত লোকসান হলো সরকারের।
রেলের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শুধু জামালপুর এক্সপ্রেসই নয়, বিভিন্ন ট্রেনের ক্ষেত্রে নানারকম অভিযোগ আসছে যাত্রীদের কাছ থেকে। আমরা সেগুলো সহজ ডটকমের সাথে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছি।
শওকত জামিল মোহসি জানান, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে টিকিট বিক্রি করার কারণে রেলের কত টাকা লোকসান হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হিসাব শেষ করে সহজ ডটকমের কাছ থেকে তা কেটে নেওয়া হবে। সহজ ডটকমের ভুলের কারণে রাজস্ব হারাবে সরকার তা হবে না। আমরা হিসাব করছি। টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট করতে পারলেই তা সহজের কাছ থেকে আদায় করা হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনে ভুল না হয় তা নিয়েও সহজকে সতর্ক করা হয়েছে।
রেলের টিকিট বিক্রির দয়িত্বপ্রাপ্ত নতুন প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের মিডিয়া ম্যানেজার ফারহাত আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে তিনি অবগত নন। সহজের কারিগরি দলের সঙ্গে আলাপ করে এ ব্যাপারে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
কেন এমন হয়েছে তারও কোনো উত্তর দেননি সহজ ডটকমের মিডিয়া ম্যানেজার। সহজের প্রকৌশল দলের সঙ্গে আলাপ করে যাত্রীদের সব অভিযোগ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
-B










