আরব সাগরের বুকে দর্শনীয় এক সেতু

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশ কুয়েত। বড় বড় স্থাপত্যের জন্যও খ্যাতি আছে তাদের।
সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যবর্তী ছোট্ট এই দেশে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সেতু শেখ জাবের আল আহমদ আল সাবাহ
কসওয়েএই সেতুটি কুয়েত সিটি থেকে আরব সাগরের ওপর দিয়ে যুক্ত হয়েছে বুবিয়ান ও সুবিয়া দ্বীপের সঙ্গে। সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য ৪৮.৫৩ কিলোমিটার এবং এটি ৩১ মিটার প্রশস্ত।
মূল কসওয়ে বা সুবিয়া সংযোগ ৩৬ কিমি দীর্ঘ। এটির ২৭ কিমি হলো সামুদ্রিক সেতু সংযোগ।
সেতুটি কুয়েত উপসাগরের দক্ষিণ দিকের শুওয়াইখ বন্দর এলাকার শুওয়াইখ থেকে শুরু হয়ে সুবিয়া দ্বীপে শেষ হয়েছে। ৩৭ কিলোমিটারের প্রধান কসওয়েতে ১২০০টি ফাউন্ডেশন পাইল রয়েছে।
তাছাড়া ৬১৩টি স্টিলের স্তুপ, ১২০০টি পিলার এবং ১২১১টি প্রি-কাস্ট এবং কাস্ট-ইন-প্লেস রয়েছে। উপকূলীয় পাইলগুলির ব্যাস ৯৮ ইঞ্চি। অফশোর পাইলের ব্যাস ১১৮ ইঞ্চি।
সেতুর মাঝখানে প্রতি চারটি পিলারে পরপর দুটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সবার বোঝার সুবিধার্থে কিছুদূর পরপর ইংরেজি ও আরবিতে লেখা বিভিন্ন দিকনির্দেশনা সাইনবোর্ড রয়েছে।
২০১৩ সালে কোরিয়ান কোম্পানি হুন্ডাই ই অ্যান্ড সি ও স্থানীয় কনসোর্টিয়াম কম্বাইন্ড গ্রুপ কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল।
২০১৯ সালের ১ মে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়।সেতু নির্মানে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই প্রকল্পটি কুয়েত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ২০৩৫ এর অংশ। কুয়েতের ১৩ তম আমির শেখ জাবের-এর অবদানকে স্মরণ রাখতে তার নামেই সেতুর নামকরণ করা হয়েছে।
কসওয়ে সেতুটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল একটি প্রধান ক্যাবল-স্টেয়েড ব্রিজ, যাতে ২০০ মিটার স্প্যান এবং একটি আর্ক পাইলন রয়েছে।
সেতুর দুই পাশে বন্দর, প্রশাসনিক ভবন, পর্যটন কেন্দ্র- সব মিলিয়ে ১৫ লাখ বর্গমিটার জায়গার ওপর এটি নির্মিত। সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ পানির ওপরে রয়েছে। এটি কুয়েত সিটিকে সুবিয়া দ্বীপের সঙ্গে সংযুক্ত করছে, যেখানে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মেগা-সিটি নির্মিত হচ্ছে।
কুয়েতের বৃহত্তম দ্বীপ সুবিয়াত এবং উপসাগরীয় রাজ্যের রাজধানী কুয়েত সিটির মধ্যবর্তী দূরত্ব আগে ছিল ১০৪ কিলোমিটার।
অথচ আল কসওয়ে সেতুর কারনে এটি মাত্র ৩৭ কিমি দূরত্বে পরিনত হয়েছে।
সেতুটি ইন্টেলিজেন্স ট্রান্সপোর্ট মনিটরিং সিস্টেম দিয়ে সজ্জিত। এটি যানবাহনগুলোকে ট্র্যাকিং করার পাশাপাশি ট্র্যাফিক পর্যবেক্ষণ, ট্র্যাফিক লঙ্ঘনের প্রতিবেদন এবং ভ্রমণের সময়কাল রেকর্ড রাখতে সক্ষম। এসব তথ্য নজরদারি ও বিশ্লেষণের জন্য কুয়েতি ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
শেখ জাবের আল কসওয়ে সেতু কুয়েত এবং আরব বিশ্বের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় প্রকল্প। এটি কুয়েত এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশাল অর্থনৈতিক প্রভাব রাখবে।সাধারণভাবে বলতে গেলে একটি সেতু শুধুমাত্র ভৌগোলিক সংযোগ হিসেবে কাজ করতে পারে না, বরং এটি উন্নয়ন, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির একটি সংযোগ হিসেবেও কাজ করে।
শেখ জাবের ব্রিজ কুয়েত সিটিকে ভবিষ্যতের সিল্ক রোড প্রকল্পের সাথে যুক্ত করবে, যা এই অঞ্চলে উন্নয়নের একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে।
কুয়েতের পাশাপাশি সৌদি আরব, ইরাক এবং ইরানের অনেক মানুষ এতে উপকৃত হবে। কুয়েতে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা তাদের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব মিলে সেতুটি এক নজর দেখতে আসেন।
কর্মব্যস্ততার মাঝে মনকে প্রফুল্ল রাখতে আরব সাগরের ওপর নির্মিত এই সেতু ঘুরে দেখেন তারা
সেতুর উপর থেকে সাগরের দৃশ্য বেশ মনোমুগ্ধকর। যতদূর চোখ যায় সাগরের নীল জল আর বড় বড় ঢেউ দেখা যায। এছাড়া হিমেল হাওয়া দুই পাশ থেকে ভেসে এসে দেহ ও মনকে শীতল করে দেয়। আল কসওয়ে ব্রিজ থেকে কুয়েত সিটি দেখলে মনে হয় আরব সাগরের মাঝে কোন ছোট দ্বীপদিনের আলোয় যেমন সৌন্দর্য ছড়ায় সেতুটি, তেমনি সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় এটি আরও দ্বিগুণ সুন্দর হয়ে উঠ। অবশ্য সেতুর ওপর গাড়ি পার্কিং করা নিষিদ্ধ। তবে সেতুর উপর পর্যটকরা চলার পথে গাড়ি থামিয়ে ছবি ও সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়আবার বিনোদনের জন্য সেতুকে কেন্দ্র করে কৃত্তিম উপায়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজেক্ট। ধীরে ধীরে বিনোদনের জন্য পর্যটকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে শেখ জাবের আল কসওয়ে সেতু।
এর পাশাপাশি কুয়েতের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এটি ।
-B










