প্রকৃতি কন্যা জাফলংয়ে প্রবেশ ফি বন্ধে জেলা প্রশাসককে মন্ত্রীর চিঠি

অবশেষে বন্ধ হচ্ছে জাফলং পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ ফি। সম্প্রতি এই ফি’র জন্য পর্যটকদের নির্যাতনের পর কঠোর সমালোচনার মধ্যে জেলা প্রশাসন সাময়িক ভাবে ফি আদায় বন্ধের নির্দেশ দেন। গতকাল (১০ মে) ওই এলাকার সাংসদ এবং প্রবাসীকল্যান ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ সিলেটের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) একটি চিঠি দিয়ে ফি বন্ধের অনুরোধ জানান।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন- ‘জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক পর্যটনস্পট সমূহের প্রবেশ ফি নির্ধারণ, আদায় এবং আদায়কৃত অর্থ ব্যবহার সংক্রান্ত কোন আইনানুগ বিধান জারি হয়েছে কি না তা জানা প্রয়োজন’।
চিঠিতে ৫ মে পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সিলেটের জাফলংয়ে প্রবেশ ফি নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক ও পর্যটকদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যা সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো সম্পর্কে ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
দেশে ও বিদেশে এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে, যা কখনোই কাম্য নয়। তা ছাড়া জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে প্রবেশ ফি নির্ধারণ, আদায় ও আদায় করা অর্থের ব্যবহার–সংক্রান্ত কোনো আইনানুগ বিধান জারি হয়েছে কি না তা জানা প্রয়োজন। মন্ত্রী এ সংক্রান্ত নীতিমালা বা বিধিবিধান জানানোর অনুরোধ করেছেন এবং চূড়ান্তভাবে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রবেশ ফি আদায় বন্ধ রাখতে বলেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলোচনা করে সময়োপোযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়।
মন্ত্রীর চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান বলেন, চিঠি পেয়েছি। চিঠি পাওয়ার আগেই জাফলং থেকে প্রবেশ ফি আদায় বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির পরবর্তী বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত প্রবেশ ফি আদায় বন্ধ থাকবে।
পর্যটন উন্নয়ন কমিটির পরবর্তী বৈঠক কবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি এখনও নির্ধারণ হয়নি। তারিখ নির্ধারণ হলে আপনাদের জানানো হবে।
সিলেটের অন্যতম পর্যটন এলাকা গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং। জাফলংকে বলা হয় প্রকৃতি কন্যা। সব সময়ই জাফলংয়ে পর্যটককদের ভীড় লেগে থাকে। আগে এখানে বিনামূল্যে পর্যটকরা প্রবেশ করতে পারলেও গত বছর থেকে ১০ টাকা প্রবেশ ফি চালু করেছে উপজেলা প্রশাসন।
কিন্তু গত ৫ মে জাফলংয়ের টিকিট কাউন্টারের কর্মীরা পর্যটকদের ওপর হামলা চালানোর পর এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, পর্যটন মন্ত্রণালয় নির্ধারিত কার্যপরিধির বাইরে গিয়ে জাফলংয়ে পর্যটক প্রবেশে ফি নির্ধারণ করে জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের বাইরে গিয়ে এভাবে ফি নির্ধারণ অবৈধ ও এখতিয়ার বহির্ভূত।
২০২০ সালের ৩ নভেম্বরর তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সিলেট জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির এক সভায় জাফলংয়ে ১০ টাকা হারে প্রবেশ ফি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২০২১ সালে ৮ নভেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব শ্যামলী নবী সাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে দেশের জেলা ভিত্তিক পর্যটন উন্নয়ন কমিটি পুণর্গঠন করা হয়। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ওই প্রজ্ঞাপনে পর্যটন উন্নয়ন কমিটির জন্য ১৩ টি কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়। এই কার্য পরিধির কোথাও প্রবেশ ফি আদায়ের কথা উল্লেখ নেই। তারপরও গত বছর থেকে জাফলংয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি আদায় করা হচ্ছে।
জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটির ওই সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়- ‘প্রবেশ ফি এর আদায় করা অর্থ থেকে প্রয়োজনীয় জনবলের বেতন ও আনুষাঙ্গিক খরচ বহন করা হবে। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পরবর্তীতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যটন সংশ্লিস্ট ফান্ড গঠনের জন্য একটি ব্যাংক একাউন্ট খোলা হবে।
জাফলংয়ে প্রবেশ ফি চালুর ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তাহমিলুর রহমান বলেন, ২০২১ সালে ৮ নভেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রনালয়ের প্রজ্ঞাপনের আলোকেই ফি চালু করা হয়েছে।
তবে ওই প্রজ্ঞাপন ঘেঁটে দেখা গেছে, পর্যটন উন্নয়ন কমিটিকে ১৩টি কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এতে কোথাও ফি নির্ধারণ বা আদায়ের কথা উল্লেখ নেই।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, প্রজ্ঞাপনের কার্য পরিধি না মেনে পর্যটন উন্নয়ন কমিটির এভাবে ফি আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ ও এখতিয়ার বর্হিভূত। তারা এটা করতে পারেন না। মন্ত্রণালয় নির্ধারিত কর্মপরিধির মধ্যেই তাদের থাকতে হবে।
-B










