অব্যাহত ভাঙনে সৌন্দর্য হারাচ্ছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা

পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সৈকতজুড়ে এখন শুধু ভাঙনের খেলা চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের উত্তাল ঢেউ একে একে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার স্পটগুলো। সৌন্দর্য হারাতে বসেছে অপরূপ সৌন্দয়ের লীলাভূমি সাগর কন্যা কুয়াকাটা।
একই সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের একমাত্র সুযোগ রয়েছে পর্যটকদের কাছে "সাগরকন্যা" হিসেবে পরিচিত কুয়াকাটায়। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ছুটির দিন ছাড়াও বর্তমানে প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ভিড় করেন সাগর কন্যা কুয়াকাটার অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
পদ্মা সেতুর জন্য সরাসরি সড়ক যোগাযোগ চালু হওয়ায় ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের সংখ্যা কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। কুয়াকাটা সাগর সৈকতে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে আর্ন্তজাতিক মানের কয়েকটি হোটেল মোটেল রিসোর্টসহ দেড় শতাধিক হোটেল মোটেল কটেজ।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার প্রশস্ত সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা প্রকৃতির এক অপূর্ব লীলাভূমি। ঋতুভেদে এ বিশাল সমুদ্র সৈকত ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শীতের কুয়াকাটা শান্ত আর বর্ষার কুয়াকাটা উত্তাল উন্মত্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মধ্যে কুয়াকাটার আলাদা বৈচিত্র রয়েছে। কারন বিশ্বের একমাত্র এই সমুদ্র সৈকত থেকেই সুর্যোদয় ও সূর্যাস্তের লোভনীয় মনোরম সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। তাই কুয়াকাটায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণে মুখরিত থাকে। ১৯৯৮ সালে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার পর থেকে সারা বিশ্বের পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কুয়াকাটা। বিনিয়োগকারীরাও ছুটে এসে হোটেল-মোটেলসহ স্থাপনা নির্মাণ করে কুয়াকাটাকে সৌন্দের্যের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু সাগরের অব্যাহত ভাঙনের ফলে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ছোট হয়ে আসছে। আট কিলোমিটার প্রশস্ত সৈকত এখন সঙ্কোচিত হয়ে এমন হয়েছে যে. জোঁয়ারের সময় পর্যটকরা সৈকতের বেলাভূমিতে নামতে পারছে না। সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সৈকত লাগায়ো সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
কুয়াকাটা সাগর সৈকত ছিল সাজানো গোছোনো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাগরের বড় বড় ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙন সৈকত ছাড়িয়ে বর্তমানে সাগর পাড়ের স্থাপনাগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সৈকতের জিরো পযেন্টের বেড়ি বাঁধের সীমানা।
ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে এলজিইডির একটি ডাকবাংলো, সাগর সৈকত সংলগ্ন কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানের অধিকাংশ এলাকাসহ নারকেল বাগান। হুমকির মুখে রয়েছে সাগর পাড়ের নিকটবর্তী মসজিদ, মন্দিরসহ ছোটবড় মার্কেটগুলো।
পানি উন্নয়ন বোর্ড পটুয়াখালী সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় বিপদসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এতে করে স্মরণকালের ৭ থেকে ৮ মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আঘাতে কুয়াকাটা বীচ সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রাথমিক ভাবে ২০১৯ সালে যখন ভাঙন রোধকল্পে জিওটিউব ও জিও ব্যাগ দিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক ভাবে কাজ শুরু করা হয়। তার সুফলও পাওয়া যায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতের আগে। কিন্তু ইয়াসের প্রভাবে ঢেউয়ের আঘাতে পানি আসা যাওয়ায় বীচের বালি সরে যাওয়ায় স্থাপিত জিওটিউবগুলো বসে যাওয়ার বড় ধরনের ক্ষতি হয়।
শুরুতে কুয়াকাটা বীচ রক্ষার জন্য স্থায়ী কার্যক্রমের জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি ডিপিপি সাবমিট করা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে স্থানীয় দাবির প্রেক্ষিতে টেকসই কার্যক্রমের জন্য পুনরায় সমীক্ষার দাবি করা হয়। এ জন্য ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার মডেলিংকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে পূর্ণগঠিত ডিপিপি সাবমিট করা হয়। এতে সম্ভাব্য ব্যায় ধরা হয়েছিল ৭৫০ কোটি টাকা।
স্থায়ী কোন উদ্যোগ না নেয়ায় দীর্ঘ সৈকতের জাতীয় উদ্যানসহ ঝাউবাগান দুই তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে গেছে। কড়ই, নারিকেল, তাল ও সেগুন বাগান সাগর গিলেছে। জেলে পল্লীর দুই তৃতীয়াংশ স্থাপনা সাগরে ভেসে গেছে। এখন নিয়মিত উত্তাল ঢেউ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের বুকে ঝাপটা দেয়।
হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন এই বেড়িবাঁধের বাইরে সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকানগুলোতে চলে বেচাকেনা। খুটা জেলেদের সংগঠন আশার আলো মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নিজাম শেখ জানান, বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাস করছে শত শত খুটা জেলেরা। সৈকত রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এসব জেলেরা হারাবে আবাসস্থল। জিরো পয়েন্ট থেকে পর্যটকরা গঙ্গামতি লেক এবং খাজুরা লেম্বুরচর পর্যন্ত ঘুরতে গিয়ে সৈকতের ভাঙনের তান্ডব দেখে হতাশা ব্যক্ত করেন। সৈকত রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপের অভাবে শত শত বিনিয়োগকারী জায়গা কিনে কোন কিছুই করেননি।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, অব্যাহত ভাঙনে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। দ্রুত সমাধান করা না হলে পর্যটকরা এখানে আসতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটা ভাঙন রোধে টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। তবে ভাঙন রোধে প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখছেন না তারা। কুয়াকাটা এখন যে ভাবে ভাঙছে তাতে এলাকার লোকজনসহ বিনেয়োগকারীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
কুয়াকাটা পৌর মেয়র মো: আনোয়ার হাওলাদার বলেন, সরকার কুয়াকাটা নিয়ে ব্যাপক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিলেও সবার আগে প্রয়োজন কুয়াকাটা সৈকত ভাঙন প্রতিরোধ। তা না হলে উন্নয়ন টিকসই হবেনা, ভাঙনে উন্নয়নও বিলীন হবে।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফ হোসেন জানান, ‘কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন’ নামে ১ হাজার ২১১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গত ফেব্রুয়ারিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে গত ২২ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শরীফা খান, সচিব ও জয়েন্ট চিফ পরিকল্পনা কমিশন গত ১ জুলাই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
প্রাথমিকভাবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদের মধ্যে রয়েছে সমুদ্রতীরবর্তী তীর রক্ষার কাজ, বাধ নির্মাণ, বাধের ঢালের প্রতিরক্ষা কাজ, ডিসিপার্ক, মসজিদ ও মন্দির এলাকায় প্রতিরক্ষা কাজ। এছাড়াও ওয়াকিং বে, বসার স্থান ও পার্কিং এলাকার প্রতিরক্ষা কাজ, রাস্তা পাকা করা, বিনোদন পার্ক, রেস্তোরাঁসহ আরও অনেক কাজ।
-B










