স্পেনে অবহেলিত প্লেন রাখার বিশাল ক্ষেত্র
মাঠঘাট ও শুকনা খেতের মাঝে মরীচিকার মতো বস্তুগুলি দেখলে অবাক লাগতে পারে৷ অসংখ্য প্লেন সেখানে চোখে পড়ে৷ করোনা মহামারির শুরু থেকেই স্পেনের আরাগন অঞ্চলে তেরুয়েল ইউরোপের সবচেয়ে বড় প্লেন রাখার জায়গা হয়ে উঠেছে৷
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, এয়ার ফ্রান্স ইত্যাদি বিশ্বের বিভিন্ন প্লেন সংস্থার একশোরও বেশি প্লেন সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ এক তৃতীয়াংশ জেট জার্মানির লুফটহানসা সংস্থার৷ করোনা মহামারির ফলে প্লেন চলাচল থমকে যাওয়ার পর সেগুলির প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল৷
স্টেফান ভিস ও মাটিয়াস হোহর্স্ট এবার একটি এয়ারবাস প্লেন ফ্রাংকফুর্টে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন৷ কারণ, মানুষ আবার বিপুল সংখ্যায় প্লেনেরর টিকিট কাটছেন৷ এমন চাহিদা মেটাতে এই প্লেনটিরও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে৷
হোহর্স্ট বলেন, ‘‘জায়গাটিকে সত্যি মিউজিয়ামের মতো দেখতে লাগছে৷ বিমানবন্দরের প্রাণশক্তির কিছুই এখানে নেই৷ অদ্ভুত নীরবতা, কোনো মুভমেন্ট নেই৷ গাড়িঘোড়াও চোখে পড়ে না৷ সত্যি বিচিত্র পরিবেশ৷ সে সময়ে আমি নিজে কোনো প্লেন এখানে উড়িয়ে আনি নি৷ তবে সহকর্মীদের কাছে অনেক কিছু শুনেছি, ছবিও দেখেছি৷ সে সব দেখেশুনে জায়গাটিকে কবরস্থান মনে হয়েছিল৷ প্লেনগুলি এখানে নিয়ে আসা হয়েছে৷ তখন মনে হয়েছিল সেগুলি সম্ভবত সেখানেই থেকে যাবে৷ এখন আবার আমাদের প্লেনফেরত নেবার পালা৷ সেটা অসাধারণ এক অনুভূতি৷''
তেরুয়েল ছোট শহর, জনসংখ্যা প্রায় ৩৬,০০০৷ বাতিল প্লেনগুলি শহরের জন্য আখেরে সুফল বয়ে এনেছে৷ টারমাক নামের কোম্পানির ১৩০ জন কর্মীর পাকা চাকুরি তো আছেই৷ সেই সংখ্যা আরও বাড়ানো হচ্ছে৷ প্রতি সপ্তাহে বেশিরভাগ প্লেনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে হয়৷ কারণ ইঞ্জিন ও চাকা আবার আকাশে ওড়ার যোগ্য রাখা জরুরি৷
করোনা কোনো এক সময়ে নির্মূল হয়ে গেলেও টারমাক কোম্পানির কাজের অভাব থাকবে না৷ কারণ আগামী ২০ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫,০০০ প্লেন বাতিল করে টুকরো টুকরো করতে হবে৷ নির্দিষ্ট সময় ওড়ার পর অথবা বাণিজ্যিক উপযোগিতা আর না থাকলে প্লেনের এমন দশা হয়৷
কোম্পানির তিন বর্গ কিলোমিটার জমিতে আর জায়গা হচ্ছে না৷ তাই দাঁড়িয়ে থাকা প্লেনগুলির পাশেই নতুন হ্যাঙার তৈরি হচ্ছে।
টারমাক কোম্পানির প্রধান পেদ্রো সায়েস বলেন, এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপের অবস্থা অনেক ভালো৷ অ্যামেরিকায় বাতিল প্লেন প্রায়ই মরুভূমিতে ফেলে রাখা হয়৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়৷
পেদ্রো সায়েস বলেন, ‘‘মনে রাখতে হবে, রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায়ও আমরা কিন্তু প্লেনের ওজনের ৯৪ শতাংশের বেশি উপাদান উদ্ধার করি৷ দামী উপাদানগুলি উদ্ধার করে এক তালিকা করা হয়৷ মালিকের জন্য সেটা জরুরি৷ কিছু যন্ত্রাংশ আবার নতুন করে প্লেন তৈরির শিল্পে কাজে লাগানো হয়৷ গড়ে সেই তালিকায় দেড় থেকে দুই হাজার যন্ত্রাংশ থাকে, যেগুলি বাতিল প্লেন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে৷''
প্লেন ফেরত নিয়ে যাবার এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ উড়ালের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুতি লাগে৷ কারণ তেরুয়েল মোটেই প্রচলিত কোনো বিমানবন্দর নয়৷ সেখানে এয়ার ট্রাফিক কনট্রোল ও ইলেকট্রনিক গাইডেন্স সিস্টেম নেই৷ পাইলটদের তাই কাগজের মানচিত্রের উপর নির্ভর করে প্লেন ওড়াতে হয়৷
পাইলট হিসেবে মাটিয়াস হোহর্স্ট বলেন, ‘‘এয়ার ট্রাফিক কনট্রোলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই৷ রানওয়ের দিকে এগোনোর সময় তথাকথিত ইউনিকম ফ্রিকুয়েন্সিতে কথা বলতে হয়৷ এই অঞ্চলে সব প্লেনেরই নিজেদের মধ্যে সেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কথা বলে৷ সেই ফ্রিকুয়েন্সিতে আমরা নিজেদের পরিকল্পনা জানিয়ে আকাশে উড়ি৷ আমাদের নির্দিষ্ট কোনো ডিপার্চার রুট থাকে না, যা সাধারণত এয়ার ট্রাফিক কনট্রোল দিয়ে থাকে৷ আমরা উত্তর দিকে রওয়ানা হয়ে নীচে হাইওয়ে দেখে সারাগোসার দিকে উড়ে যাই৷ পথে কাছের এয়ার ট্রাফিক কনট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়৷ সেখান থেকে আমাদের আকাশে আরও উপরের স্তরে যাবার নির্দেশ আসে৷ তারপর থেকে স্বাভাবিকভাবে উড়াল চলে৷''
এয়ারবাস এ৩৪০ প্লেনটির উড়ালের ছাড়পত্র পেতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগলো৷ ফ্রাংকফুর্টে পৌঁছে প্লেনটির আরও দুই সপ্তাহ ধরে রক্ষণাবেক্ষণ হলো৷ তারপরই সেটি যাত্রীবাহী রুটে চলার জন্য উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পেলো৷ ছুটি কাটিয়ে অ্যামেরিকা, আফ্রিকা বা এশিয়ায় চলাচল শুরু করলো প্লেনটি৷
-B










