তিন মাস পর কাল শুরু হচ্ছে সুন্দরবন ভ্রমন

আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের পর্যটন মওসুম। এ মওসুমে পদ্মা সেতুর কারণে বনে অতিরিক্ত ট্যুরিস্টের চাপ মোকাবেলা করতে হবে বলে বন বিভাগ ধারণা করছে।
স্বাভাবিকভাবে এটা বনের পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থায় সুন্দরবন ভ্রমণ আরো পরিবেশবান্ধব করা বা ইকো ট্যুরিজম বিকাশে বন বিভাগ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। তার মধ্যে রয়েছে ট্যুর অপারেটরদের প্রশিক্ষিত গাইড প্রদান এবং কমিউনিটি ট্যুর পরিচালনা।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমের কারণে পয়লা জুন থেকে তিন মাস সুন্দরবনে ট্যুরিস্ট ও বনজীবীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। ১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার থেকে সে নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ভ্রমণে যাওয়ার জন্য ট্যুরিস্টদের অনুমতি দেয়া হচ্ছে, যদিও এখন দুই-একটা ট্যুর বোট বনে যাবে। ব্যাপকভাবে ট্যুরিস্ট আগমন শুরু হবে আরো পরে।
দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ভ্রমণ পরিচালনায় খুলনা অঞ্চলে তিন শতাধিক ট্যুর অপারেটর রয়েছে। এর মধ্যে খুলনাতেই আছে ৬০টির মতো। এই ৬০টির মধ্যে আবার ৪০টির নিজস্ব লঞ্চ বা বোট রয়েছে। বাকিরা ভাড়া করা বোট বা লঞ্চে ট্যুর পরিচালনা করে।
বনে গিয়ে ট্যুরিস্টরা উচ্চৈঃস্বরে চেঁচামেচি করে এবং নিজেদের সাথে আনা নানা ধরনের খাবার বন্যপ্রাণীদের খেতে দেন। এ ছাড়া সুন্দরবনের নদনদীতে ও বনের মধ্যে যত্রতত্র পানির খালি বোতল ও খাবারের প্যাকেটসহ নানা বর্জ্য নিক্ষেপ করেন। এতে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও সার্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা।
বন বিভাগ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপের পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে বনের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করে ভ্রমণ চালু রাখার জন্য ইকো ট্যুরিজম পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু স্লোগান হিসেবে সেটা যতটা বলা হয়, বাস্তব ক্ষেত্রে ততটা কার্যকরী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব বাস্তবতা সামনে রেখে বন বিভাগ ইকো ট্যুরিজম আরো বাস্তবভিত্তিক করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেনের সাথে কথা বলা হয়। তিনি জানান, সুন্দরবনে পরিবেশ সম্মত ভ্রমণে সহায়তা করার জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ট্যুরিস্টদের প্রোপারলি গাইড করার জন্য দক্ষ গাইড প্রয়োজন। সারা দুনিয়ায় গাইডরা হচ্ছে ট্যুরের প্রাণ। অথচ সুন্দরবনে যাওয়ার ক্ষেত্রে এরকম গাইড নেই। এজন্য আমরা ট্যুর গাইডদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। সাত দিনের প্রশিক্ষণের একটি মডিউল তৈরি করা হয়। এর মধ্যে চার দিন থিওরিটিক্যাল। বাকি তিন দিন লঞ্চে প্রাকটিক্যাল, কিভাবে ট্যুরিস্টদের সাথে কথা বলতে হয় এবং সুন্দরবনকে চেনাতে হয় তা শেখানোর উদ্দেশে। এর ভিত্তিতে ট্যুর বন্ধ থাকার তিন মাসে ২০ জন করে তিনটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আরো দেয়া হবে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে সাফল্যজনকভাবে প্রশিক্ষণ সমাপনকারীদের লাইসেন্স প্রদান করা হবে। এটা সম্পন্ন হলে বনবিভাগের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এসব গাইড নেয়া ব্যতীত ট্যুর অপারেটরদের বোট নিয়ে বনে প্রবেশে অনুমতি দেয়া হবে না।
তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত. আমরা বনের পাশে বসবাসরতদের দিয়ে কমিউনিটি ট্যুরিজম চালুর চিন্তা করছি। একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে একটা ফ্যামিলি অথবা ছোট গ্রুপকে একজন মাঝি এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা বনের ভেতর থেকে ঘুরিয়ে আনতে পারবে। এতে যারা বেশি খরচ করতে পারে না, তারাও বন ঘুরে দেখতে পারবেন। সেইসাথে বনের পাশের লোকজন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। ফলে তাদের ঝুঁকি নিয়ে চুরি করে বনের গাছ কাটা বা হরিণ শিকার করতে হবে না। ইতোমধ্যে ডিঙ্গি নৌকা যারা চালাবেন, আমাদের বন রক্ষা কমিটির সদস্য তাদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাদের একই রঙের পোশাক থাকবে। সবার নৌকার একই রঙ থাকবে। এখন যে সাউন্ড ও ওয়াটার পল্যুশান হয় সেটাও এ ট্যুরে হবে না। আমরা কালাবগী, মুন্সীগঞ্জ ও কলাগাছিয়া কেন্দ্রিক এ ট্যুর চালুর চেষ্টা করছি। সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা-২০১৪ সংশোধন করে আরো সময়াপোযোগী করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক ও রূপান্তর ইকো ট্যুরিজম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল আজম ডেভিড বলেন, সুন্দরবনে ট্যুরের ক্ষেত্রে গাইড এবং নৌযানের মাস্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তি। বড় বোট বা লঞ্চে দুইজন এবং ছোট লঞ্চে কমপক্ষে একজন প্রশিক্ষিত গাইডের প্রয়োজন। আমাদের প্রশিক্ষিত গাইড নেই। আমরা আগে থেকেই বলে আসছিলাম। এতদিন পর সুন্দরবন বন বিভাগ ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা খুবই ভালো উদ্যোগ।
-B










