বিনোদন কেন্দ্রে দর্শনার্থীর ঢল চাঙ্গা পর্যটন খাত

তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে ঈদের ছুটিতে পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের ঢল নেমেছিল। ঈদের তৃতীয় দিনেও দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল। স্বজনদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে বিনোদন কেন্দ্রে ছুটছে মানুষ। সকালের দিকে উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুরের পর যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এতে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের পর্যটন খাত।
কক্সবাজার থেকে আমাদের প্রতিনিধি জাফর আলম জানান : অতীতের মতোই কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। বিশ্বের দীর্ঘতম এ সৈকতে যেন তিল ঠাঁই নেই। রোববার সকাল থেকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে পর্যটকদের ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। সৈকত ছাড়াও ভিড় বেড়েছে ইনানী, হিমছড়ি, রামু, মহেশখালী, টেকনাফের বিভিন্ন পর্যটন স্পটসহ সেন্টমার্টিন দ্বীপে। ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে সাগরের নীল জলরাশি ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছে দুই লক্ষাধিক পর্যটক।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম সিকদার জানান, ঈদের ছুটিতে সমুদ্র শহর কক্সবাজারে অনেক পর্যটক আসছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে এরই মধ্যে ৮০-৯০ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে। সমিতির অধিভুক্ত সব হোটেলকে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য বলা হয়েছে।
সাভার থেকে আসা নাজমুল হোসেন বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে আমরা ২০ জনের একটি গ্রুপ বাস ভাড়া নিয়ে কক্সবাজার এসেছি। আসার সময়ও রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়েছি। আবার এখানে এসে দেখি হোটেল রুমে চড়া দাম। ঈদের পর ছুটিকে পুঁজি করে দাম নিচ্ছে হোটেল মালিকরা।’
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক ইমরান শাহিন বলেন, ‘অনেকদিনের পরিকল্পনা ছিল ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে আসার। সেই আশা পূরণ হয়েছে। তবে হোটেলে ভাড়া একটু বেশি নিয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় যত পর্যটক স্পট রয়েছে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পর্যটকরা যেন কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে।’
কুয়াকাটা : ঈদের তৃতীয় দিনেও পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত কুয়াকাটা সৈকত। সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটক সমাগম বাড়লেও এবারের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সেই সংখ্যা কয়েক গুণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। স্থানীয় মার্কেটে রাখাইন তরুণ-তরুণীরা বিভিন্ন সামগ্রীর পসরা নিয়ে বসে গেছেন। এছাড়া কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থান নারিকেল কুঞ্জ, ইকো পার্ক, জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার, ফাতরার বনাঞ্চল, গঙ্গামতী, লেম্বুরচর, শুঁটকিপল্লীসহ সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব ও পশ্চিমে মনোমুগ্ধকর সমুদ্রের বেলাভূমি, একাধিক নয়নাভিরাম লেক ও সংরক্ষিত বনায়ন যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। ঈদের ছুটিকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য উপভোগ করছেন। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে শনিবার থেকেই সৈকতে পর্যটকের ঢল নামতে শুরু করে। এতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে।
কুয়াকাটা অতিরিক্ত ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সৈকতে পর্যটকের নিরাপত্তা দিতে আমাদের টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে পোশাকধারীর পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ থাকবে।’
আবাসিক হোটেল সি-ভিউ ম্যানেজার সোলায়মান ফরাজী বলেন, ‘ঈদের তৃতীয় দিনও আমাদের হোটেলের সবগুলো কক্ষ বুকিং রয়েছে। আশা করি এবারের ঈদে রেকর্ডসংখ্যক পর্যটক আসবে।’
সিরাজগঞ্জ: বন্যা, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সিরাজগঞ্জ জেলাবাসীর যেন নিত্যসঙ্গী। যমুনার ভাঙন আতঙ্কে জেলা শহরের অনেকে পাকা ভবন নির্মাণের সাহস করত না। কিন্তু এর পরিবর্তন ঘটে ১৯৯৬ সালে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ (হার্ড পয়েন্ট) নির্মাণের ফলে। ২ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। ফলে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায় সিরাজগঞ্জ শহর। নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে শহর রক্ষা বাঁধকে আরো শক্তিশালী করতে সিরাজগঞ্জ শহরের উত্তরে যমুনা নদীর উজানে দুটি ও ভাটিতে আরো দুটি ক্রসবার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। নদীভাঙন ঠেকাতে যমুনা নদীর তীরে করা এ বাঁধ এখন আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে জেলাবাসীর কাছে।
বাঁধ ও বাঁধকে টেকসই করতে দেয়া কংক্রিটের ব্লক ও সিঁড়ি রীতিমতো দর্শনীয় স্থানে রূপ নিয়েছে। বাঁধগুলো ভ্রমণপিপাসু মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এক সঙ্গে নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে জেলা ও জেলার বাইরে থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী মানুষ আসছে জেলা শহরসংলগ্ন যমুনা নদীর তীরে।
জেলার বেলকুচির স্কুলশিক্ষক জান্নাতুল ফেরসৌস বলেন, ‘শহর রক্ষা বাঁধ ও ক্রসবার বাঁধগুলো খুবই আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন। উৎসব, ছুটির দিন কিংবা সুযোগ পেলেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বেড়াতে আসি।’
রংপুর: ঈদের দিন থেকেই জেলার দর্শনীয় স্থান, বিনোদন কেন্দ্র ও পার্কগুলো ছিল লোকে লোকারণ্য। সব বয়সী মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে রংপুর নগরীর নিসবেতগঞ্জ ঘাঘট নদী, টাউন হল চত্বর, কাউনিয়ার শতবর্ষী তিস্তা রেলওয়ে সেতু, গঙ্গাচড়া মহিপুর শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু পয়েন্টে। এছাড়া রংপুর চিড়িয়াখানা বিনোদন উদ্যান, রংপুর শিশুপার্ক, তাজহাট জমিদার বাড়ি ও জাদুঘর, সিটি চিকলি বিনোদন পার্ক, প্রয়াস সেনাপার্ক, চিকলি ওয়াটার পার্ক ও রূপকথা থিম পার্কে টিকিটের জন্য দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন দেখা যায়। টিকিট কেটে প্রবেশ করতেও যেন রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। একই চিত্র রংপুর মহানগর থেকে একটু দূরের খলেয়া গুঞ্জিপুরে ভিন্নজগত, পীরগঞ্জের আনন্দনগর, বদরগঞ্জের মায়াভুবন, কাউনিয়ার তিস্তা পার্ক, পীরগাছা-সুন্দরগঞ্জের আলী বাবা থিম পার্কেও। ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের মধ্যে ঈদ উদযাপনের খোরাক জোগাচ্ছে এসব বিনোদন কেন্দ্র।
-B










