পর্যটক টানছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত ‘পুঠিয়া রাজবাড়ি’

রাজশাহী: বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে পুঠিয়া রাজবাড়ি অন্যতম। রাজপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে সেই ‘রাজবাড়ি’ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আজও। রাজবাড়িটির সেই প্রভাব প্রতিপত্তি ও জৌলুস নেই ঠিকই কিন্তু এর নান্দনিক সৌন্দর্যের ঐশ্বর্য মানুষকে বিমোহিত করে রেখেছে এখনও।
এই পুঠিয়া রাজবাড়ি হয়ে উঠেছে রাজশাহীর অনন্য পর্যটন কেন্দ্র। কেবল রাজশাহী নয়, দেশ-বিদেশের পর্যটকরাও প্রতিদিন ছুটে আসছেন এর চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের টানে। এই রাজবাড়ির বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন তারা। এটি সমানভাবে সমৃদ্ধ করছে দেশের ইতিহাস গবেষকদেরও।
রাজবাড়ি চত্বরটি রয়েছে ৪ দশমিক ৩১ একর আয়তনের জমির ওপর। ২০২১ সালের ২০ নভেম্বর ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রাজবাড়িটি জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই পুঠিয়া রাজবাড়িটি এখন জাদুঘর। পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের জন্য অনেকটা নতুন করেই সাজানো হচ্ছে ঐতিহাসিক এই রাজবাড়িটি।
পুরোনো অবকাঠামো ঠিকঠাক রেখেই ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হচ্ছে পুরো রাজবাড়িটি। এখন এটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
বর্তমানে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে রাজাদের ব্যবহৃত সিন্দুক, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় আসবাবপত্র। তাই জাদুঘরটি দেখতে রোজই মানুষের ঢল নামছে। আর ঈদসহ যে কোনো বড় উপলক্ষে জাদুঘরটি দর্শনার্থী ও পর্যটকদের মিলনমেলায় পরিণত হচ্ছে। মাত্র ৩০ টাকা দর্শনীয় বিনিময়ে দিনভরই পুঠিয়া রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন আগত দর্শনার্থীরা।
বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে এখানকার পুরাকীর্তিগুলোতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়। ওই সময় সন্ধ্যার পরেও রাজবাড়ি দেখতে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ভিড় জমান।
আর এখানে কেবল প্রাচীন রাজবাড়িই নয় রয়েছে বেশ কয়েকটি মন্দিরও। তবে আসলে যেই প্রাসাদটি সবাই পুঠিয়া রাজবাড়ি হিসেবে চেনেন বা জানেন, সেটি কিন্তু পুরোনো সেই রাজবাড়ি নয়। এটি নির্মাণ করা হয়েছিল অনেক পরে।
রাজবাড়ির সামনের সুদৃশ্য স্তম্ভ, অলংকরণ, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়াল, ফুল ও লতাপাতার সরব উপস্থিত এক নান্দনিক নির্মাণশৈলীর পরিচয় বহন করছে। যার অনুপম সৌন্দর্যের ঐশ্বর্য আজও পর্যটকদের বিমোহিত করে চলেছে। রাজবাড়ির ছাদ সমতল। ছাদে লোহার বিম, কাঠের বর্গা ও টালি ব্যবহৃত হয়েছে। আর বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য রাজবাড়ির চারপাশে ওই সময় পরিখা (দীঘি) খনন করা হয়েছিল।
ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি বা পাঁচআনি রাজবাড়ি হচ্ছে- পুঠিয়ার মহারানি হেমন্ত কুমারী দেবীর বাসভবন। আগে থেকেই এখানকার আশপাশে প্রাচীন রাজপ্রাসাদ থাকলেও ১৮৯৫ সালে আকর্ষণীয় ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতিতে আয়তাকার দ্বিতল রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন মহারানি হেমন্তকুমারী দেবী।
পাঁচআনির রাজ পরগনার রাজা ছিলেন পরেশ নারায়ণ। তার স্ত্রী ছিলেন মহারানি হেমন্তকুমারি দেবী। রাজার নাম তেমনভাবে কেউ না জানলেও উদার ব্যক্তিত্ব কর্মগুণ ও দানশীলতার জন্য ইতিহাসে আজও ভাস্বর হয়ে আছেন মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী।
প্রজাবাৎসল ও দানশীল রানি হিসেবে তাই মহারানি হেমন্ত কুমারীর নাম এখনও রয়েছে রাজশাহীর মানুষের মুখে মুখে।
রাজশাহীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেও উঠে আসে তার নাম। রাজশাহীতে ঢোপকল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পানিজনিত মহামারির হাত থেকে এখানকার মানুষকে পরিত্রাণ দিতে তার অবদান আজও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করা হয়। কালের আবর্তে ঐতিহ্যবাহী সেই ঢোপকল আজ বিলুপ্ত হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার নাম থেকে গেছে।
আর পুরোনো রাজবাড়ির সামনের অংশে নতুন এই রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন, তার শাশুড়ি মহারানি শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে।
সপ্তদশ শতকে মুঘল আমলে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পুঠিয়া রাজবাড়ী ছিল সবচেয়ে প্রাচীন।
জনশ্রুতি রয়েছে- জনৈক নীলাম্বর সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করার পর এটি 'পুঠিয়া রাজবাড়ি' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর আগে ১৫৫০ সালে বৎসাচার্যের পুত্র পিতাম্বর রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, রাজশাহীর পুঠিয়ার রাজবাড়ি দেশের একটি অনন্য পুরাকীর্তি। এখনও এর পুরো সংস্কার কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে রানীঘাটের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। আরও অনেক সংস্কার কাজ বাকি আছে। সব কাজ শেষ হলে রাজবাড়িটি আরও বেশি দর্শনীয় হবে। তখন দর্শনার্থী আরও বাড়বে। সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে- দেশের পাশাপাশি এখন বিদেশি পর্যটকও বাড়ছে।
-B










