আসছে বৈচিত্র: বাড়ছে পর্যটক, ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পর্যটন

ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, পহেলা বৈশাখ কিংবা অন্য কোনও ছুটির মৌসুমে ঘুরতে যাওয়া যাওয়া মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে।
বিভিন্ন বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক টানা ছুটির পাশাপাশি বছরের অন্যান্য সময়েও এই সংখ্যাটা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে রুচিতে যেমন ভিন্নতা এসেছে, তেমনই ভ্রমণপিপাসুদের ক্ষেত্রেও ঢের বৈচিত্রতা দেখা যাচ্ছে।
আবহমানকাল থেকে প্রধানত দুই ঈদ ছুটিতে ঢাকা ছেড়ে শেকড়ের সন্ধানে বাড়িমুখী হতে দেখা যেত বিপুল সংখ্যক মানুষকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় রকমের পরিবর্তন এসেছে। গড়ে উঠেছে অসংখ্য টুরিস্ট ক্লাব, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রিসোর্টের সংখ্যাও।
ঈদের সময় বিশেষ করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় স্থানগুলোতে ঘুরতে বা বেড়াতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাটা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা নানা ধরনের দর্শনীয় বা নৈস্বর্গিক স্থানগুলো। এছাড়া পর্যটকদের বয়স, পেশা ও ধরনেও বৈচিত্রময়তা চোখে পড়ার মতো।
পর্যটক সংগঠনগুলো বলছে, এবারের কোরবানির ছুটি লং টুরে যাওয়া মানুষের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছেন তরুণরা বা আপার টিনেজাররা। কর্পোরেট চাকরিজীবী, সিঙ্গেল মাদার, নারী উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও কম নয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতিও আগের থেকে অনেকটা বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টুরিস্ট ক্লাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশের নানা প্রান্তের পাঁচটি স্পটে ১৩০ জনের বেশি ঘুরতে গেছেন এই ঈদে। এর মধ্যে সুন্দরবনের নতুন গড়ে ওঠা ইরাবতী ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে গেছেন ৬০ জনের মতো। আপার টিনেজারদের দু’টি টিমে ২০ জন করে ৪০ জন, কর্পোরেট টিমে ১০ জন, সিঙ্গেল মাদারদের ১০ জনের একটি টিম রয়েছে। এদের মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছিই নারী।
এছাড়া ক্লাবটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন বয়সের ৪০ জন গেছেন দুটি টিমে ভাগ হয়ে। কক্সবাজারে গেছেন আলাদা আলাদা করে ৬ জোড়া কাপল।
ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি ‘গার্লস গ্রুপ’ সাজেকে গেছে, সংখ্যাটা ১১০ জনের। সিলেটের একাধিক স্থানে ১২ জনের টিনেজার একটি টিম গেছে ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি বেড়িয়ে আসতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টুরিস্ট ক্লাব বাংলাদেশের চেয়ারপার্সন আঁখি সিদ্দিকা বলেন, বিভিন্নভাবে টুরিজমের ক্ষেত্রে বড় ধরনের একটি পরিবর্তন এসেছে। যান্ত্রিক ও নগরকেন্দ্রিক জীবনে প্রযুক্তিগত চাপ বেড়েছে। দমবন্ধ করা অবস্থা থেকে অল্প সময়ের জন্য হলেও মুক্তি পেতে চাইছে মানুষ। সে জন্য প্রকৃতির কাছে, পাহাড় ও নদীর কাছে, বন ও সবুজের কাছে যাচ্ছে তারা।
ইরাবতী ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক কামাল খান বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষার দিকটি মাথায় রেখেই তারা এই ইকো সিস্টেমের রিসোর্টটি গড়ে তুলেছেন। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশিদের এটি টানতে নতুন মাত্রা যোগ করবে আশা করি।
এই রিসোর্টে বেড়াতে যাওয়া সিঙ্গেল মাদার অ্যানি চৌধুরী বলেন, সামাজিক ও আর্থিক চাপের মধ্যে থাকতে হয় সব সময়। টানা কাজের মধ্যেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে প্রকৃতির কাছে ছুটে যাই। একাকী সময় কাটানোর জন্য সিঙ্গেল মাদারদের জন্য টুরিস্ট গ্রুপগুলো বেশ ভালো বিকল্প হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার পাশাপাশি কম খরচে ঘুরে আসা যায়। এর আগে সাজেকসহ বিভিন্ন স্থানে বেরিয়েছি, সারাদেশ ঘোরার ইচ্ছে আছে।
বাংলার যাযাবর নামে আরেকটি টুর গ্রুপের পক্ষ থেকে এই ঈদে বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে ৯ জনের একটি টিম গেছে। জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে তারা। গ্রুপটির প্রধান নির্বাহী বলছেন, প্রতিটি অকেশনেই আমরা বিভিন্ন স্থানে ইভেন্টের আয়োজন করে থাকি। আগের চেয়ে এখন ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
স্পেস টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের জুবাইর হীরা জানান, কোরবানির ঈদে দুটি টুরের আয়োজন করেছেন তারা। এর মধ্যে ৮ জনের একটি টিম নেপালে গেছে, ৭ জনের আরেকটি টিম গিয়েছে বান্দরবানে। এছাড়া প্রায়ই তারা কর্পোরেট ও শিক্ষার্থী টুরের আয়োজন করে থাকেন।
এছাড়াও ভবঘুরে ও বাউন্ডুলেসহ বিভিন্ন টুর গ্রুপ ঈদুল আজহায় দেশের নানা প্রান্তে প্যাকেজের আয়োজন করেছে বলে জানা গেছে।
ঝটিকা সফরের এডমিন জান্নাতুল ফিরদাউসী মানু বলেন, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের দূরে ঘুরতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সিঙ্গেল মাদার ও সিনিয়র সিটিজেন এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়েও ইভেন্ট আয়োজন করে থাকেন তারা। অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে এবার ভ্রমণে কিছুটা মন্দা দেখা গেলেও আগামী সপ্তাহেও একটি ইভেন্ট রয়েছে।
এদিকে, ব্যক্তিগতভাবেও হাজারো পর্যটক দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় ভিড় জমিয়েছেন। সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এর মধ্যে কক্সবাজারে কিছুটা মন্দা দেখা গেলেও পদ্মা সেতু চালুর সুবাদে কুয়াকাটায় এবার পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েছে। বন্যার কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা যাচ্ছে।
-B










